বিজয়ের গৌরবে, পঞ্চাশের উচ্ছাসে

ঢাকা: মহান বিজয় দিবস। বাঙালি জাতির হাজার বছরের শৌর্যবীর্য এবং বীরত্বের এক অবিস্মরণীয় গৌরবময় দিন। বীরের জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার দিন। পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশ নামে একটি স্বাধীন-মুক্ত ভূখণ্ডের নাম জানান দেওয়ার দিন।

সেই স্বাধীন-মুক্ত বাংলাদেশের বয়স এখন ৫০ বছর। স্বাধীনতার ৫০ বছরের এই পরিসরে দেশ ও জাতি অনেক ঘটন-অঘটন, চড়াই-উৎরাইয়ের সাক্ষী হয়েছে। সময়ে সময়ে এসব ঘটনা সমগ্র জাতিকে প্রচণ্ড ঝাঁকুনি দিয়েছে, পাল্টে দিয়েছে এর গতিপথ। কখনো জাতির জীবনে এসেছে হতাশা-অন্ধকারাচ্ছন্ন সময়। আবার সেই আঁধার ফুঁড়েই এগিয়ে গেছে দেশ। ৫০ বছর পেরিয়ে এসে আজ উন্নয়ন-অগ্রগতির এক নতুন বাংলাদেশ। সামনে আরও সুন্দর আগামীর প্রত্যাশায় উজ্জীবিত বাংলাদেশ।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৪৮ সাল থেকে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ছেষট্টির ছয় দফা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের পথ ধরে আসে একাত্তর। ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) দাঁড়িয়ে জাতির পিতার সেই উদ্দাত্ত কণ্ঠের আহ্বান— ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’— জাতিকে দেখায় স্বাধীনতার পথ। ২৫ মার্চের সেই ভয়াল রাতে গণহত্যা শুরু হলে ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণায় বিশ্ব মানচিত্রে জন্ম নেয় নতুন এক দেশ। ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠন এবং ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহিদ ও দুই লাখ মা-বোনের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আসে কাঙ্ক্ষিত বিজয়। দিনটি ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। মিত্র বাহিনীর কাছে পাকিস্তানি সেনাদের আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়। সেই বিজয়ের ৫০ বছর পূর্তির দিন আজ।

৫০ বছরের রাজনীতির ইতিহাসে সুদূরপ্রসারী বহু ঘাত-প্রতিঘাত, সংবিধান লঙ্ঘন করে অবৈধ সামরিক শাসনে হত্যাকাণ্ড-ষড়যন্ত্রের রাজনীতি, জাতীয়-আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র এবং নানা চড়াই-উতরাই ও অন্ধকারের যুগ পেরিয়ে বাংলাদেশ আজ উন্নয়ন-সমৃদ্ধির মহাসোপানে। বিশ্ব দরবারে এক বিস্ময়। টানা মেয়াদে সরকার পরিচালনায় মুক্তিযুদ্ধ স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্বদানকারী দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। বঙ্গবন্ধুকন্যা আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা টানা তিন মেয়াদে সরকার পরিচালনা করছেন। দেশ এগিয়ে চলেছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণের পথে। এই ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে অসম্ভব এক বন্ধুর ও কণ্টকাকীর্ণ পথ অতিক্রম করতে হয়েছে বাংলাদেশসহ দেশের মানুষকে।

৫০ বছর একটি জাতির জীবনে খুব বড় পরিসর নয়। তবু পরাধীনতার শিকল ভেঙে বেরিয়ে আসা সহস্র বছরের ঐতিহ্য সমৃদ্ধ আত্মমর্যাদায় বলীয়ান একটি জাতির সামনে অর্ধ শতাব্দীর এই মাইলফলক অনেক কিছুই বদলে দিয়েছে। স্বাধীনতার পর যে দেশটিকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলে কটাক্ষ করা হয়েছিল, সেই বাংলাদেশ আজ গোটা বিশ্বের সামনে এক বিস্ময়ের নাম। যে দলটির নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্থান পায় বিশ্ব মানচিত্রে স্বাধীন দেশ হিসেবে, সেই দলটির হাত ধরেই গত এক যুগে বিস্ময়কর গতিতে ঘুরে দাঁড়ানো, উন্নয়নের রোলমডেল হিসেবে বিশ্ব স্বীকৃতি আদায়কারী দেশটির নাম এখন বাংলাদেশ।

স্বাধীনতার এই ৫০ বছরে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীন দেশটির প্রতিষ্ঠাতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার মাধ্যমে স্বাধীনতাকে ব্যর্থ করার দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র যেমন দেখেছে এ ভূখণ্ডের মানুষ, তেমনি মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের হাত ধরেই স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী অর্থাৎ ৫০ বছর পূর্তির সময়ে জাতির পিতার রেখে যাওয়া স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার জাতিসংঘের স্বীকৃতিও প্রত্যক্ষ করল জাতি।

১৯৭১ সালে এক সাগর রক্তের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত এই দেশটির জন্মের ইতিহাস, বিদ্যমান সরকার ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক প্রভাব এবং মানুষের রাজনীতিমনস্কতা কেন্দ্র করে আবর্তিত। একাত্তরে অস্থায়ী সরকার গঠন এবং সংবিধান প্রণয়নের পর থেকে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের সরকার ব্যবস্থা কমপক্ষে পাঁচ বার পরিবর্তিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধু হত্যা পরবর্তী অবৈধভাবে সামরিক স্বৈরশাসক জিয়াউর রহমানের ক্ষমতা দখল, জিয়া নিহত হওয়ার পর আরেক স্বৈরশাসক এরশাদের ক্ষমতা দখল, ক্যু-পাল্টা ক্যু’র নামে হাজার হাজার সামরিক বাহিনীর অফিসার-সৈনিককে নির্বিচারে হত্যার ঘটনায় বাংলাদেশ কার্যত এক ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হয়।

বিজয়ের এই ৫০ বছরের সময়ে কেমন ছিল বাংলাদেশের ইতিহাস? স্বল্প কথায় বিশ্লেষণ করলে মানসপটে ভেসে উঠে জাতির পিতার নেতৃত্বে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে ৯ মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে পাক হানাদারদের আত্মসমর্পণের মাধ্যমে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের চিত্র। যুদ্ধবিধ্বস্ত পাকিস্তানের একটি প্রদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বিনির্মাণে জাতির পিতার ক্লান্তিহীন চেষ্টা, বিশ্বের সব দেশের স্বীকৃতি আদায়, বঙ্গবন্ধুর মাত্র সাড়ে তিন বছরের শাসনামলে একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে স্বল্পোন্নত দেশের কাতারে উন্নীত করা— সবই ইতিহাস। এরপরই কালো অধ্যায়। জাতির পিতাকে হত্যার মাধ্যমে দেশকে উন্নয়ন-অগ্রগতির মিছিল থেকে হটিয়ে ফের ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার দীর্ঘ চেষ্টা করা হয়েছে। এরপর টানা ১৬ বছর চলেছে সামরিক শাসন। এরপর সংসদীয় গণতন্ত্র ফিরলেও তিন মেয়াদের পরই আবার অনির্বাচিত সরকারের প্রত্যাবর্তন। সব মিলিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের ৫০ বছরের বড় একটি অংশই ছিল গণতন্ত্রের বাইরের যাত্রা।

স্বাধীনতার ৫০ বছরের মধ্যে স্বাধীনতা অর্জনে নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগ দেশ পরিচালনা করে সাড়ে ২১ বছর। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর জাতির পিতার বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার মাত্র সাড়ে তিন বছর দেশ পরিচালনার সুযোগ পায়। জাতির পিতাকে হত্যার পরবর্তী দীর্ঘ একুশ বছর পর ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকে পাঁচ বছর। মাঝে ৫ বছর বাদ দিয়ে ২০০৯ সালের নির্বাচনে ক্ষমতায় আসার পর এ পর্যন্ত অর্থাৎ গত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে টানা ক্ষমতায় রয়েছে বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট।

স্বাধীন বাংলাদেশের যত অর্জন, তার প্রায় সবকিছুই এসেছে এই ২১ বছরে, আওয়ামী লীগের হাত ধরে।

১৯৯৬ সালে প্রথমবার আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ভিক্ষুকের জাতি হিসেবে দীর্ঘ ২১ বছর পরিচয় পাওয়া বাংলাদেশ অর্জন করে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা। ২০০৯ সাল থেকে আওয়ামী লীগের ক্ষমতার এক যুগ ধরে দেশের মানুষসহ গোটা বিশ্ব দেখছে বাংলাদেশের উন্নয়ন-অগ্রগতি ও সফলতার ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার ম্যাজিক। ৪০ বছর ধরে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব থাকা শেখ হাসিনা শত ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে, মৃত্যুভয়কে তুচ্ছ করে চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হয়ে দেশ পরিচালনা করছেন, অর্জন করেছেন বিশ্বের ইতিহাসে দীর্ঘতম সময়ে নারী প্রধানমন্ত্রী হয়ে দেশ পরিচালনার রেকর্ড। সব মিলিয়ে আজ বাংলাদেশ গোটা বিশ্বে এক মর্যাদার নাম।

বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তীর উৎসব

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ও বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন উপলক্ষে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় ‘মহাবিজয়ের মহানায়ক’ প্রতিপাদ্যে বৃহস্পতিবার থেকে দুই দিনব্যাপী বিশেষ অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করা হয়েছে। মুজিববর্ষ উদ্যাপন জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি এ আয়োজন করেছে। অনুষ্ঠানমালার প্রথম দিন অনুষ্ঠান শুরু হবে বিকেল সাড়ে ৪টায়। অনুষ্ঠানের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিচালনায় থাকবে সুবর্ণজয়ন্তী ও মুজিববর্ষের শপথ। সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার নিয়ে জাতীয় পতাকা হাতে দেশের সর্বস্তরের মানুষ এ শপথ অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন।

প্রধানমন্ত্রীর শপথ শেষে আলোচনা পর্বে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। সম্মানীয় অতিথির বক্তব্য রাখবেন ভারতের রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ। অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখবেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক এবং স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী এবং স্বাগত বক্তব্য রাখবেন জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির প্রধান সমন্বয়ক ড. কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী। অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ রেহানা সম্মানীয় অতিথিকে ‘মুজিব চিরন্তন’ শ্রদ্ধাস্মারক দেবেন বলে জানিয়েছেন জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির প্রধান সমন্বয়ক ড. কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী।

জাতীয় পর্যায়ে বিজয় দিবসের কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ। এরপর মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রীর নেতৃত্বে উপস্থিত বীরশ্রেষ্ঠ পরিবার, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও বীর মুক্তিযোদ্ধারা ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন বীর শহিদদের প্রতি। বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশি কূটনীতিক, বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনসহ সর্বস্তরের জনগণও ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাবেন জাতীয় স্মৃতিসৌধে।

এছাড়া, সকাল সাড়ে ১০টায় তেজগাঁও পুরাতন বিমানবন্দরে জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে সম্মিলিত বাহিনীর বর্ণাঢ্য কুচকাওয়াজ ও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমভিত্তিক যান্ত্রিক বহর প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হবে। রাষ্ট্রপতি এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে কুচকাওয়াজ পরিদর্শন ও সালাম গ্রহণ করবেন। প্রধানমন্ত্রীও এ কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published.